অভয়ারণ্য – পর্ব ১

অভয়ারণ্য – পর্ব ১

 

বইগুলোকে হারাতে দেব না। বইগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। দুপুরের প্রখর রোদে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল অরণ্য। চিন্তার নাটাইটা হাত ফস্কে যাচ্ছে। সুতো গুটিয়ে নিল অরণ্য। না এখানেও নেই। কিঞ্চিত আশা ছিল নিলখেতের বইয়ের জংগলের কোন এক বইয়ের আস্তরনের নিচে কাল ভ্রমরের মত লুকিয়ে আছে বইটা। কালাম ভাই থাকলে বের করে ফেলত। গত শীতে কালাম ভাই তার ছেলে ফরিদকে দোকানের ভার দিয়ে রহস্যের মৃত সনদের পাতায় আশ্রয় নিয়েছে। দোকানের সামনে কালো পাতে সাদা রঙে হাতে লেখা কালাম বুক স্টোরের জায়গায় শোভা পাচ্ছে ফরিদ কম্পোজ নামটা। ২০-২২ বছর হবে ছেলেটার বয়স। অরণ্যের প্রায় চোখের সামনেই বড় হয়েছে। বিভিন্ন সাইজের বইএর জায়গা নিয়েছে নানা ব্র্যান্ডের প্রিন্ট আর ফটোকপির কাগজ। 

 

ফরিদের দোকানটা ছেড়ে দুই দোকান সামনে এগুলো অরণ্য। মডার্ন বুক হাউজ। এক সময় এখানেই অরণ্যের দেখা হয়েছিল আনুশকার সাথে। আনুশকার বইয়ের নেশা ছিল। একটা মানুষ কিভাবে একাডেমিক বইয়ে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকতে পারে তা অরণ্য কোনদিনই বুঝে উঠতে পারেনি। আনুশকাই ওকে বই পড়া শিখিয়েছিল। একদিন আনুশকা ওকে একটা বই উপহার দিয়েছিল। কালপুরুষ, সমরেশের। কি মোটা বই! দেখেই অরণ্য আঁতকে উঠেছিল। এই বই পড়তে হবে? তাও আবার পুরোটা? আনুশকা কোন কথা শুনবে না। বইটা পড়তেই হবে, এবং পড়ার পর পড়া দিতে হবে। মডার্ন বুক হাউজের সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থেকে অরণ্য স্মৃতির পাতায় হারিয়ে গেল।

 

আচ্ছা, বইগুলোর প্রতি পাতায় কি স্মৃতি? নাহ, প্রতি পাতায় স্মৃতি হয়না, স্মৃতি কিছু কিছু পাতায়। কিছু বইয়ের পাতায় পাতায় পাপড়ি লুকানো থাকতো। ফুলের। শর্ত থাকতো, কোন কোন পাতায় পাপড়ি আছে, বই পড়ে পড়ে পাতার নম্বর বলতে হবে। অরণ্য একবার ধরা পরে গিয়েছিল। না পড়েই পাতা উল্টিয়ে পৃষ্ঠার নামবার মুখস্ত করে পড়া দিতে গিয়েছিল। আনুশকা চুরিটা ধরে ফেলেছিল। জিজ্ঞেস করেছিল কোন পাতায় কোন গল্প ছিল। গল্পের সাথে মিলে রঙ দেয়া ছিল, অরণ্য তো নিয়েছে শুধু পাতার নাম্বার।

 

“এক্সকিউজ মি, একটু সরে দাঁড়াবেন প্লিজ?” রিনিঝিনি কণ্ঠের প্রশ্নে স্মৃতির পাতায় ছন্দপতন হলো। অরণ্য ফিরে এলো বর্তমানে। প্রায় এক দশক আগের এসব কথা ভেবে এখন আর কিছু হয় না। যে চলে গেছে, সে ফিরে আসবে বলে যায় নি। এখন এসব ভাবনা অসার। অরণ্য খুঁজতে থাকল। বইগুলো খুঁজে পেতেই হবে। ওই বইগুলোই এখন পারে অরণ্যের জীবনে নতুন আশার আলো জালাতে। এক দশক ধরে বয়ে চলা যন্ত্রণার উপশম ওই বইগুলোতেই আছে। চলে যাবার আগে আনুশকা একটা ধাঁধা রেখে গিয়েছিল। ওই ধাঁধাঁর জবাব মিলতে মিলতে হারিয়ে যাচ্ছে। নাহ, হাল ছাড়বে না অরণ্য। বইগুলো খুঁজে বের করতেই হবে।

 

এসব ভাবনার মাঝে আবার ছন্দপতন ঘটালো সেই রিনঝিন কণ্ঠ “কিছু খুঁজেছিলেন?”

 

“কিছু খুঁজেছিলেন?” অরণ্যকে আবারো জিজ্ঞেস করলো টিনা। “একটা ধাঁধাঁ। তাঁর উত্তর খুজছিলাম” অরণ্য ঘোরের মধ্য থেকেই জবাব দিল। দিয়েই টের পেল যে সে আসলে বই খুজছে না। খুজছে ধাঁধাঁর উত্তর। আনুশকা একটা ধাঁধাঁ দিয়েছিল। বলেছিল একটা চাবি আছে। ওই চাবিতে সব তালা খুলে যাবে। তালাগুলো খোলা এখন খুব দরকার। কিন্তু চাবিটা অরণ্য পাচ্ছেনা। হয়তো কোন বইয়ের পাতায় রয়েছে চাবিটার খোঁজ। আনুশকা বলেছিল তালাগুলো খুলে গেলেই অরণ্য যা বলবে তাই করবে সে। অরণ্য সেই ধাঁধাঁর উত্তর খুঁজে পায় নি। দশ বছর কেটে গেছে এরই মাঝে, আনুশকা আজ সাড়ে আট হাজার মাইল দুরে। হয়তো অরণ্যকে ভুলে গেছে, হয়তো ধাঁধাটাও ভুলে গেছে। কিন্তু অরণ্য ভুলেনি। ধাধটাও ভুলেনি, সময়টাও ভুলেনি। বইগুলোও ভুলেনি। বইগুলোকে খুঁজে পেতেই হবে, বইগুলোকে হারিয়ে যাচ্ছে।

 

“হ্যাঁ, কয়েকটা বই খুঁজছি, হেল্প করতে পারবেন?” টিনার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলো অরণ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *