উপত্যকায় অরণ্য – এপিসোড ৩

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ উপত্যকায় অরণ্য

এপিসোড ৩

 

নীলাম্বরী কটেজ। পাহাড়ের মাঝে সাধারণত কটেজগুলোর নাম বাংলা হয় না। লুসাই মালিকদের কটেজ দোকান সব কিছুই লুসাই ভাষায় নামকরণ হয়। এই একটা কটেজ কেন আচমকা বাংলা নাম হলো কে জানে। নিশ্চয়ই মালিকদের কেউ বাঙ্গালী আছে। লুসাইরা সাধারণত বাংলা জানে না। নিজেদের ভাষাতেই কথা বলে। এই কটেজটার বাংলা নাম দেখে অরণ্যর একটু খটকা লাগলো। কটেজটায় ঢোকার আগে অরণ্য একটু চারপাশটা ভাল করে দেখে নিল। সবুজ টিনের ঘরের উপর লাল টিনের চালা। গাছের গুঁড়ি আর বাঁশের থাম ব্যবহার করে কাঠের পাটাতনে ঘরটা তৈরি। খুব বেশী স্থায়ী কটেজ নয় বলেই মনে হলো। যেকোন সময় কটেজটা খুলে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া সহজ। হয়তো বাঙ্গালী মালিক বলে পাহাড়ের বুকে বেশী পয়সা খরচ করে স্থায়ী দালান করার সাহস পায়নি।

 

কটেজটার পেছন দিকে একটা বারান্দা আছে। শূন্যের উপর ঝুলছে। পাহারের ঢাল থেকে কমসেকম চল্লিশ ফিট উপরে হবে।  অরণ্য মোবাইলটা পকেট থেকে বের করলো। ছবির সাথে মিলিয়ে দেখল, হ্যাঁ এটাই সেই কটেজ। এখানে এই বারান্দাতেই ছিল মেয়েটি। কিন্তু বারান্দার সাথে লাগোয়া ঘরটায় বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। তাহলেকি এখান থেকে ও চলে গেলো?

 

অরণ্যকে কটেজটার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখে কেউ একজন অরণ্যর কাছে এগিয়ে এলো। যিনি এলেন তাঁকে দেখেই পরস্কার বোঝা যাচ্ছিল ইনি বাঙ্গালী। মাঝারী গড়ন, বিশাল ভুঁড়ি, চকচকে টাক, ক্লিন শেভড মুখ। পরিষ্কার বাংলায় অরণ্যকে নিজের পরিচয় দিয়ে হাত বাড়ীয়ে দিলেন হ্যান্ডশেক করার জন্য। “আপনাকে দেখে টুরিস্ট মনে হচ্ছে। আমি রাজীব পাশা, এখানেই থাকি, আপনাকে কোনভাবে সাহায্য করতে পারি?” অরণ্য ক্যামেরাটা গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করলো। “আমি অরণ্য, আপনি ঠিকই ধরেছেন, এখানে বেড়াতেই এসেছি। তবে বেড়ানোর সাথে ছোট্ট একটা কাজেও এসেছি। পরিচিত হয়ে ভালই হলো। এখানে বাঙ্গালী পাওয়াটা বেশ কঠিন।”

 

রাজীব পাশা অরণ্যর মিষ্টি কথায় তেমন কান দিলেন না। কঠিন চেহারার লোক, ভুরু কুঁচকে আরও কঠিন চেহারা করে অরণ্যকে জিজ্ঞেস করলেন “মনে হয় কিছু খুঁজছেন, কি খুঁজছেন বললে সাহায্য করতে পারি”। সেনাবাহিনী থেকে মেজর পদে থাকার সময় স্বেচ্ছা অবসর নেয়া অরণ্যর কাছে রাজীব পাশার ঠাণ্ডা কণ্ঠ ঠিক ভাল ঠেকল না। আসল ঘটনা লুকিয়ে একটু হাসিমুখে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে পাশার হাতে দিল অরণ্য। তাতে লেখা, অরণ্য আহমেদ, প্রধান নির্বাহী, অভয়ারণ্য এন্টারটেইনমেন্টস লিমিটেড। রাজীব এর দিকে ফিরে অরণ্য বলল, “আমি একটা কন্টেন্ট প্রোডাকশন ব্যাবসা করছি। দেশের বিভিন্ন চমৎকার লোকেশনে আমরা প্রচুর শুটিং করি। এবার পাহাড়ে একটা মিউজিক ভিডিও করার জন্য লোকেশন খুজছিলাম। আপনার কটেজটা খুবই সুন্দর। এটা কি ভাড়া হয়?”

 

রাজীব পাশা কার্ডটা পকেটে পুরে স্বভাবসুলভ ঠাণ্ডা কিন্তু কঠিন কণ্ঠে বললেন “না, এটা ভাড়া হয় না। এখানে আমি থাকি।” অরণ্য আরেকবার অনুরোধ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু পাশা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এটা আমার ব্যাক্তিগত এলাকা। এইসব শুটিং এর জন্য এদিকে ঘোরাফেরা করে লাভ হবে না। এটা পাবেন না।” বলেই হন হন করে কটেজে ফিরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন রাজীব পাশা। অরণ্য বুঝল এখানে আরও কয়েকটা দিন থাকতে হবে।

 


কপিরাইটঃ লেখক © ২০১৭। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
probhat.com এ প্রকাশিত যেকোন লেখা প্রভাতের পূর্ব অনুমতি ব্যাতিত অন্যত্র প্রকাশ করা কিংবা অন্য যেকোন মাধ্যমে কপি পেস্ট করা বাংলাদেশ কপিরাইট আইন দারা নিষিদ্ধ।
প্রভাতে প্রকাশিত সমস্ত লেখা বাংলাদেশ কপিরাইট আইন দ্বারা নিবন্ধিত। প্রভাত একটি বাংলা সাহিত্য বিষয়ক ওয়েব সাইট। এই ওয়েব সাইটে প্রকাশিত সমস্ত লেখা লেখকের ব্যাক্তিগত সম্পদ। লিখিত অনুমতি ব্যতিরকে এই সাইটের কোন লেখা কপি করা, পরিবর্তন করা, পরিমার্জন করা, ছাপানো ইত্যাদি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয়। প্রভাতের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে লিখুন এই ঠিকানায় admin@probhat.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *