সেই সাতদিনঃ তৃতীয় দিন

দহন

বড় গল্পঃ সেই সাতদিন – তৃতীয় দিন

আশিক মজুমদার

*********************************************

আমি আনুশকা। অরণ্যকে দশ বছর আগে ফেলে আসা আনুশকা। একদিন এক ভোরে অরণ্যর গভীর কুয়াশার ডাক উপেক্ষা করে চলে আসা আনুশকা। আমি সেই আনুশকা। অরণ্যকে ভুলে নতুন জীবন সাজিয়ে নেয়া আমি এই দশ বছর পরে কেনইবা ওকে কথা দিলাম ওর বাসায় যাব? জানিনা। কিছুই জানিনা। শুধু অজানা অদৃশ্য কোন চৌম্বকীয় টান আমাকে এলোমেলো করে দিয়েছিল।  গতকাল অরণ্যর বাসায় যাব বলেছিলাম। অরণ্য নিশ্চয়ই আমার জন্য অনেকক্ষণ স্টেশনে অপেক্ষা করেছে। করবেইতো, ওতো কখনোই আমার সাথে দেখা হবে জানলে দেরী করেনি। বরং আমিই ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কত কতদিন আমি আসবো বলেও আসিনি। একদিনতো আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে মারও খেয়েছিল মহল্লার ছেলেদের হাতে। আরেকদিন তুমুল বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল পুরো তিন ঘণ্টা। আমি যাব বলেও যেতে পারিনি কতদিন। আমি কি ইচ্ছে করেই এমন করতাম? মাঝে মাঝে হয়তো করতাম। ওর ভালবাসার পরীক্ষা নিতাম। সেই পরীক্ষায় অরণ্য কখনোই ফেল করেনি। তবুও আমি ওকে ফেলে এসেছিলাম। ভুলে যেতে চেয়েছিলাম ওর অপার্থিব ভালবাসা। এতো ভালবাসা নেবার শক্তি হয়তো আমার ছিল না। অরণ্যর ওই বেশী বেশী ভালবাসায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তাই একদিন হুট করেই, হ্যাঁ, হয়তো কিছুটা ঝোঁকের বশেই রাকিবের হাত ধরে পাড়ি দিলাম অনেক দুর। অরণ্যকে একলা ফেলে, বহুদূর। রাকিব আমাকে ভালবেসেছিল কিনা জানিনা, তবে একটা মোহ ছিল। কেমন যেন একটা স্বাধীনতার আনন্দ ছিল। অরণ্য কি আমাকে ডেকেছিল? হ্যাঁ, হবে হয়তো। ডাকারইতো কথা। আমাকে ছাড়া অরণ্য কাউকে কোনদিন ভালবাসতে পারবে না। আমি জানি, পারেনি। যেদিন আমি ওকে একলা নিয়তির হাতে ছেড়ে চলে এলাম, সেদিন ও অনেক কেঁদেছিল হয়তো। আমি ফিরে তাকাইনি। জানতাম ফিরে তাকালে আর ফেরা হতো না আমার।

মাঝে মাঝে ইদানীং সেইসব দিনের কথা যে একেবারে ভাবিনা, ঠিক তা নয়। অরণ্যকে আমি শাস্তি দিয়েছিলাম। ও বলেছিল ভালবাসা নাকি বাঁধনে জড়াবার জন্য সৃষ্টি হয় না। ভালবাসলে পেতেই হবে কথাটা নাকি যুক্তিহীন। তাহলে এখনো কেন আমি মাঝে মাঝেই রাকিবের মাঝে অরণ্যকে খুঁজি? কেন বিকেলের রোদ পড়া বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে রাকিবের মাঝে আমি অরণ্যকে দেখি? অরণ্যর ভালবাসা জাদু। মোহ নয়। এক অগাধ অমোঘ শক্তিশালী আকর্ষণ। দশ বছরেও সেই ভালবাসা ফিকে হয়নি এতটুকুও। দশ বছরেও আমি এখনো বুঝিনি অরণ্যকে আমি চাই কিনা। নাকি চাই না, বুঝে উঠতে পারিনি। রাকিব আর আমার সংসারে যখন আমাদের ছেলে এলো, রাকিবের কোলে আমার ছেলেকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল অরণ্য আসলে সংসারের জন্য নয়। অরণ্য মুক্ত, এসব জঞ্জাল জীবনের ভার বোঝা বয়ে বেড়ানোর দায়িত্ব নেই। অপরিবর্তিত অরণ্য আমার স্মৃতিতে চিরসবুজ এক প্রেমের মূর্তি। অরণ্য কখনো স্বামী নয়, পিতা নয়, অভিভাবক নয়। অরণ্য আমার জীবনের আজীবন প্রেমের উৎস। এই প্রেমের কথাই হয়তো ও বলেছিল। অরণ্যরা স্বামী হয় না। অরণ্যরা প্রেমিক হয়ে বেঁচে থাকে আনুশকাদের হৃদয়ে, কাল, মহাকাল।

গতকাল অরণ্যর বাসায় যাবার কথা ছিল আমার। বিকেলে বের হবার সময় তুমুল বৃষ্টি নামল। মনে পড়ে গেল দশ বছর আগের সেই অরণ্যর কথা। সেই তিন ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভেজা জুবুথুবু অরণ্যর কথা। আচ্ছা ও কি এখনো আমাকে সেই একই রকম ভালবাসে? ওর ভালবাসাই যে আমার এই প্রেমহীন জীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র শক্তি। বৃষ্টিটা খুব সুন্দর। কুয়ালালামপুরের বৃষ্টি আর ঢাকার বৃষ্টি খুব একটা ভিন্ন নয়। আমি জানি অরণ্য আমার জন্য তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবে। থাকুক অরণ্য দাঁড়িয়ে। এই দাঁড়িয়ে থাকাটা আমাদের দুজনের কাছেই যে খুব প্রিয় ছিল। ওর কি তা মনে আছে? একটু অপেক্ষায় থাকুক। দশ বছর এর তুলনায় দুটো দিন আর এমন কি কঠিন। গতকালের সেই বৃষ্টিটা এখনো থামেনি। দুদিন ধরেই জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছি। কানাডায় বৃষ্টি দেখিনি বহু বছর। আমি বৃষ্টি দেখব অরণ্য, তুমি আমার অপেক্ষায় থাকো।

 

 

 

————-
কপিরাইটঃ আশিক মজুমদার © ২০১৮। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

এই গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে probhat.com এ। প্রভাতে প্রকাশিত যেকোন লেখা প্রভাতের কিংবা লেখকের পূর্ব অনুমতি ব্যাতিত অন্যত্র প্রকাশ করা কিংবা অন্য যেকোন মাধ্যমে কপি পেস্ট করা বাংলাদেশ কপিরাইট আইন দারা নিষিদ্ধ।

প্রভাতে প্রকাশিত সমস্ত লেখা বাংলাদেশ কপিরাইট আইন দ্বারা নিবন্ধিত। প্রভাত একটি বাংলা সাহিত্য বিষয়ক ওয়েব সাইট। এই ওয়েব সাইটে প্রকাশিত সমস্ত লেখা লেখকের ব্যাক্তিগত সম্পদ। লিখিত অনুমতি ব্যতিরকে এই সাইটের কোন লেখা কপি করা, পরিবর্তন করা, পরিমার্জন করা, ছাপানো ইত্যাদি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয়। প্রভাতের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে লিখুন এই ঠিকানায় admin@probhat.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *