সেই সাতদিন – দ্বিতীয় দিন

দহন

বড়গল্পঃ সেই সাতদিন

দ্বিতীয় দিন

আমি অরণ্য। দশ বছর আগে ভাগ্যের কাছে হেরে যাওয়া একজন পরাজিত সৈনিক। দশটি বছর অনেক লম্বা সময়। প্রায় হাজার বছরের সমান। কিংবা তারচেয়েও বেশী। কোন এক শীতের ধূসর কুয়াশায় ঢাকা ভোরে আনুশকা চলে গিয়েছিল। যাবার আগে বলেছিল “অপেক্ষায় থেকো, আমি ফিরবো”। ফিরেনি কখনো। আনুশকা আমাকে কখনো মিথ্যে বলেনি। আমি জানি সেবারও সত্যিটাই বলেছিল। ও একদিন ফিরবে, ফিরতে ওকে হবেই। অরণ্য হেরে যেতে পারে, ভালবাসা হারে না। ভালবাসা কখনো হারে না। ভালবাসা মানেই পরিণতি নয়। এটা অরণ্য জানে। আনুশকা জানে কি? ভালবাসা হয় অন্তরে। শরীর সেখানে গৌণ। ভালবাসলেই সংসারী হতে হবে এটা ভ্রান্তি। ভালবাসলেই পেতে হবে এটা সংকীর্ণতা। ভালবাসতে সাধনা লাগে। ভালবাসা বুঝতেও সাধনা লাগে। আনুশকা কি কখনো সেই সাধনা করেছিল? আমি জানিনা। আনুশকা কখনো অরণ্যকে ভালবেসেছিল কিনা তা কেউ জানে না। কোনদিন কেউ জানবেনা। কারণ আনুশকা নিজেই কোনদিন জানতে পারেনি চিরন্তন ভালবাসা কি, কিভাবে হয়।

এতদিন পর আনুশকা যখন আমায় জিজ্ঞেস করে আমি আজো ওকে ভালবাসি কিনা, তখন আমি জবাব দিতে পারি না। –

– অরণ্য তুমি কি আজো আমায় ভালবাস?

– তুমি আসবে বলে গিয়েছিলে। কখনো এলে না।
– এইযে দেখা হলো।
– এমন দেখাই কি হবার কথা ছিল? এভাবে দেখা হোক তুমি তো চাও নি। তুমিতো বলেছিলে যেদিন তোমার ইচ্ছে হবে, সেদিন দেখা হবে।
– নিয়তি হয়তো আজ আমাকে তোমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
– তুমিতো কখনো আমার মনের আড়াল হওনি। শেষবার বলেছিলে মনের চোখে দেখতে। মনের চোখতো অন্ধ নয়।
– ছাড়ো ওসব কথা। তুমি কেমন আছ? কুয়ালালামপুরের কি করছ?
– পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
– মানে কি? কি করেছ তুমি? পালিয়ে বেড়াচ্ছ মানে কি?
– মানে বুঝবে না। এখানে ব্যাবসা করি। দোকানদারির ব্যাবসা।
– বিয়ে করেছ? ছেলেমেয়ে আছে?
– আমার খবর নিও না। তুমি এখানে কি করছ বলো।
– বেড়াতে এসেছি। সাতদিন থাকবো।
– কোথায় উঠেছ?
– ফারেনহাইট সুইটস। তুমি কোথায় থাকো?
– চিনবে না, এখান থেকে দুর আছে। স্যাফ্রন কনডো, সেন্টুল ইস্ট।

এরপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। কথা আর আগায় না। দশ বছর আগের হারিয়ে যাওয়া আনুশকা বলার মতো তেমন কিছু পায় না। আমিই নীরবতা ভাঙ্গি।
– একদিন এসো না আমার ওখানে।
– তোমার ফ্যামিলি?
– ওরা ঢাকায়। এখানে আমি একলা থাকি। ভয় পেলে এসোনা।
– কিভাবে যেতে হয়?
– খুব সহজ, ট্যাক্সিতে যেতে পারো। অথবা তোমার হোটেলের সামনেই এমআরটি স্টেশন আছে, সেন্টুল স্টেশনে নামলেই হবে। আমি অপেক্ষায় থাকবো। কবে আসছো?
– আগামীকাল বিকেল ৪টায়। তুমি স্টেশনে থাকবে।

আজ বিকেল চারটায় আনুশকার আসার কথা। সকালে ফোন করে কনফার্ম করেছে। আমি গত এক ঘণ্টা ধরেই স্টেশনে। সাড়ে চারটা বেজে গেছে। আনুশকা এখনো আসেনি। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। কুয়ালালামপুরে সারা বছরই বৃষ্টি ঝরে। তবে আজকের বৃষ্টিটা একটু অন্যরকম। ঝুম বৃষ্টি। মন ভাল করে দেয়া বৃষ্টি। আমি বসে আছি দুটো ছাতা নিয়ে। বাইরে গাড়ী পার্ক করা। ঘড়ির কাঁটা কার সাথে যেন পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অপেক্ষা কষ্টকর হবার কথা। কিন্তু কেন জানি এই অপেক্ষা আনন্দের, অপেক্ষা শেষ হবার অপেক্ষা।

————-
কপিরাইটঃ আশিক মজুমদার © ২০১৮। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

এই গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে probhat.com এ। প্রভাতে প্রকাশিত যেকোন লেখা প্রভাতের কিংবা লেখকের পূর্ব অনুমতি ব্যাতিত অন্যত্র প্রকাশ করা কিংবা অন্য যেকোন মাধ্যমে কপি পেস্ট করা বাংলাদেশ কপিরাইট আইন দারা নিষিদ্ধ।

প্রভাতে প্রকাশিত সমস্ত লেখা বাংলাদেশ কপিরাইট আইন দ্বারা নিবন্ধিত। প্রভাত একটি বাংলা সাহিত্য বিষয়ক ওয়েব সাইট। এই ওয়েব সাইটে প্রকাশিত সমস্ত লেখা লেখকের ব্যাক্তিগত সম্পদ। লিখিত অনুমতি ব্যতিরকে এই সাইটের কোন লেখা কপি করা, পরিবর্তন করা, পরিমার্জন করা, ছাপানো ইত্যাদি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয়। প্রভাতের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে লিখুন এই ঠিকানায় admin@probhat.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *